শাস্ত্রবিরোধী সুখ
নিধুভূষণ দাস
(দ্বিতীয় কিস্তি)
২রা বৈশাখ মায়ের কাছেই থেকে গেল অপূর্ব।বর্ষশুরুর দিন রাতেই মাকে জানিয়ে রেখেছিল দুদিন পর একেবারে সোমবার ফিরবে ঢাকায়। মা মুচকি হেসেছিল।ঝর্ণা আজ তাড়াতাড়িই এসে গিয়েছে। অপূর্বকে নিয়ে রাতভোর কত্তো স্বপ্ন দেখলো, সে চলে যাওয়ার আগে তাকে এক পলক দেখার, চোখের ভাষায় মনের কথা বলার লোভ সামলাতে পারলো না।
"রাতে ঘুম হয়নি বুঝি!" শুধোয় অপূর্ব।
"কে বললো?"
"চোখ দুখান লাল তো,তাই বললাম।"
"নিজের চোখওতো লাল।"
"তাই বুঝি!"
"মাকে জিজ্ঞেস করলেই হয়।"
"রাতে একটা পরীর সঙ্গে মজা হলো।কত্তো কথা,কত্তো মাখামাখি!ঈর্ষা হচ্ছে তো!"
"ঈর্ষা কেনো,আমি কার কে?"
"তুমিই জানো।"
"শোনো আমি এখন যাই।বড়মা, আসি গো।"
"৺দাড়া।মার সঙ্গে কথা হলো?"
"তোমার ছেলেকে মায়ের খুউব পছন্দ।"
"তোর কতটা?"
"জানোইতো। সে জানি, তাও যদি বলিস।"
ঝর্ণার সুঢেীল গাল লাল হয়ে গেলো।বললো,"জানি না।"
"তুই কিছু বলেছিলি ওকে?"
"না তো,কেন?"
"বললে তো একেবারে সোমবার যাবে।"
"তুমিই হয়তো আদরের ছেলেকে বলেছো।"
মুচকি হেসে চারুলতা বললো," না তো।ভাবলাম তোর কথায়ই রয়ে গেলো।"
"তোমার ছেলে আমাকে কতই বা পাত্তা দেয়।"
"দেয় রে দেয়,খুব দেয়।তোরা অনেক ভাল জুটি হবি। আমি তাই চাই।"
পাশের ঘর থেকে অপূর্বর ডাক,"ঝর্ণা!"
"যাই" বলে সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে ৺দাড়ালো অপূর্বর সামনে।
অপূর্ব কিছু বললো না,নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে। এগিয়ে এসে ওকে বুকে টেনে নিলো, কপালে চুমু ৺একে বললো, "ভালোবাসি,খুউব ভালোবাসি!"
ঝর্ণার কয়েক ৺ফোটা চোখের জল রক্তিম গাল বেয়ে নেমে এলো,বললো,"আমি তোমারই।" বেশ কিছুক্ষণ আলিঙ্গনে কাটলো দুজনের।
এদিকে অপূর্বর মায়ের দরজার কড়া নড়লোঃ "দিদি,আমি রিক্তা।"
"রিক্তা তুই,সূর্য আজ কোনদিকে উঠলো রে!"
"দিদি,তুমি তো সব জানো,বোঝো।আমি বড় অসহায়।মেয়েটা তোমার কোলে আশ্রয় পেলে আমি নিশ্চিন্ত।"
"আমি তোর মেয়ের বড়মা,জানিস তো?"
" জানি তুমি ওকে কত আদর কর।"
"অপূর্বকে তোর কেমন লাগে?"
"ওর অপূর্ব নাম সার্থক,দিদি।"
"বাড়ির অন্যদের ভাবনা কেমন?"
"এসডিওর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হলে সব বিরোধিতা উবে যাবে,দেখো।"
"তাই যেনো হয়,বোন,"দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
ঝর্ণার হবু শাশুড়ি চারুলতা।
এদিক সেদিক তাকিয়ে রিক্তা ব্লাউজের নিচ থেকে বের করে একটা গলার হার চারুলতার হাতে দিয়ে বললো,"এটি হারায়নি,দিদি।আমাদের ঘরেই ছিল।এদিয়ে অপূর্বকে আশীর্বাদ করতে এলাম।"
"এক্ষুণই করবি?"
"আমার ত্বর সইছে না।"
"অপূর্ব,এদিকে আয়,তোর শাশুড়িমা এসেছেন,আশীর্বাদ করতে।"
"অপূর্ব এসে হবু শাশুড়িমাকে পা ৺ছূয়ে নমস্কার করলো।রিক্তা সোনার হারটি হবু জামাইয়ের গলায় পরিয়ে দিল।তার মাথায় ধানদুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করলো,মিষ্টি খাওয়ালো। বললো,"বাবা,আমার মেয়েটা তোমাকে খুব ভালোবাসে।পাগলিটাকে তুমি তোমার মতো করে তৈরি করে নিও।"
"এসব তোমাকে ভাবতে হবে না,পাশে থেকো।সব ঠিক হয়ে যাবে,খন।"
মায়ের চোখে জল দেখে ঝর্ণাও ৺কাদলো। চারুলতাকে নমস্কার করে বিদায় নিলো রিক্তা।চারুলতা বললো," আমি পুত্রবধূকে আশীর্বাদ করবো বিয়ের দিন।"
তখন অপূর্ব স্কুলে পড়ে। একদিন রিক্তার গলার হারটি পাওয়া যাচ্ছিল না।ওদের বাড়ির এক মহিলা বললো, "অপূর্বর মাকে দেখলাম পুকুর থেকে জল নিয়ে যাওয়ার সময় ডান হাত করা ছিল।হারটা ওই নিয়েছে। আর যায় কোথায়।অপূর্বর মা সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেল হার চোর।
গ্রামে এরকমই হয়।বিচার বুদ্ধির বালাই নেই।ইচ্ছে মতো কাউকে দাগিয়ে দেওয়ার চল।এর ফল কী হতে পারে তা ভাবা হয় না।তবে ওদের বাড়ির লোকজন ছাড়া গ্রামের অন্য কেউ হার চুরির গল্পটা বিশ্বাস করেনি।ভেবেছে এটা অপূর্বদের ৺ফাসানোর একটি ছল,যা কেরানিবাবুরা করে থাকে।
এই হারটি দিয়েই এদিন অপূর্বকে আশীর্বাদ করলো ঝর্ণার মা।চারুলতা এই ঘটনায় মজাই পেলো।আবার প্রমাণ পেলো সত্য চাপা থাকে না।
রিক্তাকে চারুলতা জানিয়ে দিল সেপ্টেম্বরে অপূর্ব জয়েন করছে, আগামী জানুয়ারিতে ওদের বিয়ে দেওয়া যায়।চারুলতার হাত ধরে রিক্তা বললো,"দিদি তুমি যা বলবে তাই হবে,আমরা মেনে নেবো।"
"তোর শ্বশুর মেনে নেবে তো?"
স্বস্তির বিদ্রুপের সুরে রিক্তা বললো,"না মেনে যাবে কোথায়,দিদি? জানে অপূর্বকে ৺ঘাটানোর ক্ষমতা ওদের নেই।"
"তাহলে ওই হোক,জানুয়ারিতে।"
"৺হ্যা আমি ঙবাড়িতে জানিয়ে দেবো,আজই,এখান থেকে গিয়েই।"
অপূর্ব সচিব পদ থেকে অবসর নিয়েছে ছয় মাস হলো। ওদের এক ছেলে,এক মেয়ে।দুজনই ডাক্তার।(শেষ)