শাস্ত্রবিরোধী সুখ
নিধুভূষণ দাস
পঞ্চাশের কোঠায় দাঁড়িয়ে সুখী দম্পতি এখন পিছন ফিরে তাকিয়ে পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে তৃপ্তির হাসি হাসে। স্বাভাবিক। তিরিশ বছর আগে যারা ওইদিন হলফ করে বলেছিলো ,এই বিয়ে সুখের হওয়ার নয়,ভগবান এতে সায় দিতে পারেননা ,তারা যে কতটা ভুল তা গ্রামের ওরা সবাই বুঝে গেছে এতদিনে। ওরা সেদিন বলেছিল,একই বংশের এত কাছের দুজনের মধ্যে বিয়ে শাস্ত্রবিরোধী। কিন্তু এই শাস্ত্রবিরোধী কাজটাই করে ফেলেছিল অপূর্ব আর ঝর্ণা। অপূর্বর বিধবা মায়ের এতে কোনো আপত্তি ছিলনা। ঝর্ণার মাবাবা শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নিমরাজি হন ,পরে বিয়েতে সম্মতি দেন ।বিয়ে হয় ঢাকেশ্বরী কালীবাড়িতে। ঝর্ণার মাবাবা তাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন ,সঙ্গে ছিল অপূর্বর মাসতুতো ভাই রজত। অপূর্ব মাকে নিয়ে বনানীর যে হোটেলে উঠেছিল সেখানেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অপূর্ব তখন কিশোরগঞ্জের এসডিও। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে বলে রজত খবর দেওয়ার পরই সাত দিনের ছুটি নিয়ে অপূর্ব ঢাকায় আসে।বিয়ের পরদিন ঝর্ণার বাবামা চলে যান ঘাগরায় গ্রামের বাড়িতে। বলে যান ,বিয়ের কথাটা তখনই বলবেননা গ্রামে গিয়ে। সবাই ছি: ছি: করবেতো !ঢাকার খুব কাছে ওই গ্রামে শহুরে হওয়া লেগে গেছে বেশ কয়েক বছর আগেই,কিন্তু সংস্কারের ঘেরাটোপ থেকে তখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি গ্রামের মানুষ ,পরচর্চা পরনিন্দার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার পুরোপুরি ধরে রেখেছিল।
অপূর্বর বয়স যখন আড়াই বছর তখন তার বাবা মারা যান , যক্ষ্মায়। তখন রোগটা দুরারোগ্য ছিল। বিধবা চারুলাতাকে তখন অনেক যাতনা ও যন্ত্রনা ভোগ করতে হয় পরিবারে এবং গোষ্ঠীর লোকদের ক্রূরতা ও নিষ্ঠুরতায়। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাওয়া চারু অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েননি। জমির ফসলে খাওয়া জুটে যেত ,নগদ উপার্জন করতেন টিউশনি করে, বাড়িতে। তখন ঝর্ণার বাবাও কম যাননি, এই বিধবাকে নানাভাবে হেনস্থা করার ক্ষেত্রে। জল তো নিচের দিকেই গড়ায়। সমাজে মেয়েরা ,বিধবা হলেতো কথাই নেই , নিচেই থাকে,গ্রামে আজও। মেয়েরা সচরাচর তা মেনেই নেয় ,কিন্তু চারুলতা এমনটা মেনে নিতে পারেননি ,লড়াই করেছেন নিজের মতো। ছেলেকে বড় এবং শিক্ষিত করার স্বপ্ন তাকে লড়াকু করেৃছিল। ঝর্ণা কেন জানি কী ভেবে চারুলতাকে সমর্থন করতো মনে মনে,সুযোগ পেলেই তার কাছে আসতো ,গল্প করত,গল্প শুনত। সুন্দরী বলে তার বাবামা তাকে পঞ্চম শ্রেনীর পর আর স্কুলে পাঠাননি। এ নিয়ে তার ক্ষোভ ছিল ,ইচ্ছে ছিল অপূর্বর মতো সেও উচ্চ শিক্ষা নেবে ,তার কাছাকাছি থাকবে। হলোনা। চারুলতার কাছে এসে ফিসফিস করে শুধু অপূর্বর প্রশংসা করতো। চারুলতার ভালো লাগতো মেয়েটিকে। খোঁজ নিত কবে কখন অপূর্ব ঢাকা থেকে ফিরবে।চারুলতা এটাকে স্বাভাবিকই মনে করতেন । গাঁয়ের ,বিশেষ করে গোষ্ঠীর এবং পাশের বাড়ির একটি ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ,অপূর্বই প্রথম এলাকার কোনো গ্রাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছেছে ,এটা কম কথা নয় ,ভাবে এবং বলে ঝর্না। চারুলতার,বলা বাহুল্য ,তা শুনতে ভালোই লাগে। রাতে বিছানায় শুয়ে ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখে যেমন সিলিঙের দিকে তাকিয়ে একা একা হাসে তেমনি ঝর্ণার কথায় তার ম্লান মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে,ঠোঁটে হাসি খেলে যায়। এক গ্রীষ্মের বিকেলে চারুলতা বালিশের ওয়ারে সুই দিয়ে ফুল তুলছিলো এমন সময় অভাবনীয় কথাটা শুনলো ঝর্ণার মুখ থেকে। "বড়মা ,আমি আজীবন তোমার সঙ্গেই থাকবো। "
"সে কী কথা ,পাগলি !তোর্ বিয়ে হবে ,টুকটুকে বর হবে ,শ্বসুর বাড়ি যাবি ,বড়লোক শ্বসুর হবে ,আমার সঙ্গে থাকবি কোন দুঃখে ,শুনি। "
"না ,আমি তোমার সঙ্গেই থাকবো। "
মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে ,কপালে চুমু এঁকে চারুলতা বললো :"এমন ভাবতে নেই মা,তুই তো বোকা নস। জানিসতো ,মেয়েদের ঠিকানা হয় শ্বসুরবাড়ি,তাইনা ?"
"তোমার বাড়িই হবে আমার শ্বসুরবাড়ি। "
ঝর্নার এই কথায় আঁতকে উঠলো চারুলতা। এ তো ভয়ংকর কথা ,জানাজানি হয়ে গেলে গ্রামছাড়া হতে হবে তাদের ! ঝর্নার দাদু যে গাঁয়ের মোরল।
"নারে মা ,তুই ভুল করছিস ,তুই এমন ভাবছিস জানতে পারলে তোর দাদু আর বাবা আস্ত রাখবেন না। "
"আমি আজই বলবো মাকে ,দেখি কী হয়। আমার ইচ্ছার কি কোনো দাম নেই, ওরা যা বলবে তাই মানতে হবে? ওরা তো বলে তোমার কাছে না আসতে ,আমি তো আসি। অপূর্বদাকে আমার ভালো লাগে ,বেশ। এতে যা হয় হবে। ওদের জন্য আমার পড়াশোনাটাও হলোনা ,"ঠোঁট কাঁপিয়ে বললো অষ্টাদশী মেয়েটি ,গাল ভিজে গেছে চোখের জলে।
সাদা ধুতির আঁচল দিয়ে মেয়েটির চোখ-মুখের জল মুছতে মুছতে চারুলতা টের পেলেন কখন যেন নিজের চোখের কোণেও জল জমে গেছে । বললো :"এমন ভাবিসনা মা ,তোর দাদু ক্ষেপে গেলে রক্ষে নেই।দেখিস, ওরা ভালো শ্বসুরবাড়ি খুঁজে তোর্ বিয়ে দেবেন টুকটুকে বরের সাথে ,তুই অনেক সুখী হবি। আমাদের কী আছে বল। কেন কষ্ট করবি সারা জীবন ?"
"না ,আমি তোমার সাথেই থাকবো ,ছাড় ওসব মাকাল ফলের কথা। বলো অপূর্বদাকে আমার মনের কথাটা বলবে কীনা ,"ভেজা গলায় জানতে চাইলো ঝর্না।
"সে নাহয় বলবো ,তাতে লাভ কি বল ?তোর কি মনে হয় অপূর্বর তোকে ভালো লাগে ?"
"আমি আসলে অপূর্বদা খুশী হয়,নানারকম গল্প করে,তুমিতো দেখই ,আমার হাত দেখে,কান টানে ,মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। "
"তা বেশ ,এসব কথা কাউকে বলিসনা যেন। তুই ছোট তাই আদর করে ,অর তো বোন নেই। "
"আমি নাহয় বোন হয়েই থাকবো সারা জীবন ওর কাছে। "
"দূর পাগলি ,তা হয় নাকি ?তোর ভবিষ্যত নেই বুঝি ! তোর ভালো ঘরে বিয়ে হবে,তুই মা হবি ,সুখে থাকবি। এসব তো ভাবতে হয়,মা। "
"আমি সব ভেবেই তোমার ঘরের বউ হতে চাইছি,যদি তোমার আপত্তি না থাকে,আমাকে যদি তোমার ভালো লাগে। "
"কে বলেছে তোকে আমার ভালো লাগেনা?কিন্তু তর ভালোটাতো আমাকে ভাবতেই হবে ,বল। "
"তাই যদি ভাব তবে অপূর্বদাকে আমার মনের কথাটা বলো। "
"সে দেখা যাবে ক্ষণ ,এখন এনিয়ে কাউকে কিছু বলিসনা যেন ,বুঝলি ?"
"বলব,একশোবার বলবো ,আজই রাতে বলবো মাকে। মা কিন্তু তোমাকে খুব শ্রদ্ধা করে,সেটা তুমি জাননা। কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনা, ওদের ভয়ে। আমি মার মতো আতঙ্কিত বউ হতে চাইনা। আমি জানি অপূর্বদা আমাকে মর্যাদা দেবে,উচ্চ শিক্ষার গুন আছেনা ?তোমাদের বাড়ির পরিবেশই আলাদা ,আমাদের বাড়ির লোক ছাড়া সবাই তোমাদের ভালবাসে,শ্রদ্ধা করে,হিন্দু-মুসলমান সবাই। এই জন্যই তো দাদুর হিংসা ,জ্বালা।"
"এই রে! সন্ধ্যা নেমে এলো,যা বাড়ি যা ,মা অপেক্ষা করছে,নিশ্চয়।"
ঝর্না বাড়ির দিকে পা বাড়ালো ,অন্য দিনের মতো দ্রুত পায়ে নয়,ধীর গতিতে,মাথা নিচু করে,ভাবতে ভাবতে। "মেয়েটা কী জানি কী কাণ্ড করে বসে,"ভাবছিল চারুলতা। সে জানে ,ঝর্নাকে দেখলে,কাছে পেলে অপূর্ব কেমন যেন হয়ে যায় ,ঝর্নারও চোখ যেন কথা বলে ,ভাবে ফুটে ওঠে তাদের মনের ভাষা।
পরদিন, মানে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন যথারীতি দুপুরের খাওয়ার পর ঝর্ণা হাজির চারুলতার কাছে। "কি গো ,চৈত্র সংক্রান্তিতে আসবেনা তোমার ছেলে ?প্রত্যেকবারই তো আসে,"শুধালো ঝর্ণা। "
"আসবে,আসবে। মায়ের হাতের জিলিপি খাবেনা !তাছাড়া বছরকার দিন আশীর্বাদ নেবে তো। "
"এবার কিন্তু আমাকেও আশীর্বাদ করবা,ভালো করে ,শুধু ছেলেকে করলে হবেনা,"দুষ্টু হেসে বললো ঝর্ণা।
"সে করবো ,তুইতো আমার মেয়ে। মেয়েকে তো আশীর্বাদ করতেই হয়। "
"মেয়ে না,মনে কারো ছেলেবউ। "
"তাও তো মেয়েই। "
একটা ভাঁজ করা ফুলস্কেপ কাগজ চারুলতার হাতে গুঁজে দিয়ে ঝর্ণা বললো ,"কাল আসার সাথে সাথে অপূর্বদার হাতে দিও এটা , তাহলে বুঝব তুমি আমাকে কোলে তুলে নিতে চাও কীনা। " এই বলে চারুলতার কোলে মাথা রেখে বললো ,"তুমি পড়ে নাও,নয়তো ভাববে তোমার ছেলেটার মাথা খাচ্ছি।"
চিঠিটা খুললো চারুলতা। সোজাসাপটা কথা লেখা,সরল মনের সরল উক্তি ,বিশ্বাসে ভরপুর :
"প্রিয় অপূর্ব(দা),
বড়মাকে বলেছি,তোমাকে আমার ভালো লাগে। তুমিতো বলবেনা,আমিই বললাম,লজ্জার মাথা খেয়ে। কি করব বল ? যা সত্যি তাই বললাম। বলেছি ,আমি বড়মার ছেলেবউ হবো ,আর তুমিইতো তার একমাত্র ছেলে,তাইনা ?আমার কথাটা নিশ্চয় বুঝতে পারছ।এবার শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে চলবেনা,চোখে চোখ রেখে দৃষ্টি বিনিময় করতে হবে। এইভাবেই আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে আপাতত। তারপর দেখা যাবে। তোমার সময় হলে বাকিটা হবে ,অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক বিয়ে। ইতি,
তোমার ঝর্ণা। "
চিঠিটা পরে চারুলতা হাসলো ,বললোনা কিছু।
কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি চারুলতার। ঝর্ণাকে নিয়ে বেশ ফাঁপরে পড়েছে সে। মেয়েটিকে তার খুব ভালো লাগে। কিন্তু ভালোলাগা আর বাস্তবে তার প্রকাশ ঘটানো ,এক জিনিস নয়। এক্ষেত্রে বিপদ অনেক। আবার ফুলের মতো মেয়েটির ইচ্ছেটাকে মেরে ফেলাও তো ঠিক নয়।অপূর্বর মনে কি আছে কে জানে !আজ সারাদিন এসব চিন্তাই ঘুরপাক খেয়ে চলছে তার মনে।ঝর্ণার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে চারুলতা। ভয় মিশ্রিত একটা আনন্দ তাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
দরজায় পরপর তিনবার টোকায় তন্দ্রা ভাঙ্গলো ঝর্নার। এই অসময়ে কে এলো ,এতো কোনো পড়শীর আসার সময় নয়। তাহলে কি আমাকে ডাকতে এসেছে ?আসেনা তো কখনো। বড়মাকে ডাকবো ?না ডাকা ঠিক হবেনা ,কাঁচা ঘুম ভাঙতে নেই। যাই ,দেখি কে -বাঘ না ভাল্লুক। মনে মনে এই ভেবে দরজা খুলে দেখে অপূর্ব মূর্তিমান। "একি ,তুমি ?"
"বিশ্বাস হচ্ছেনা ?"
"তাই বললাম নাকি ?"
"বলনি ,বুঝিয়ে দিয়েছো। ভূত নই ,ম্যাডাম। জ্বলজ্যান্ত অপূর্ব দত্ত। "
"দেখছি তো ,বলার কি আছে ,জানতাম নাতো ,তাই "অভিমানী সুরে বললো ঝর্ণা।
"ঠিক আছে,এরপর থেকে জানিয়ে আসবো। কীভাবে জনাব,চিঠি দিয়ে ?"
"তার দরকার নেই,"লজ্জায় আরক্তিম মুখ নামিয়ে অস্ফুটে বললো ঝর্ণা। ঘুরে হাত ধরে ঝাঁকিয়ে ডাকলো :"বড়মা ,দেখো কে এসেছে ,ওঠো তাড়াতাড়ি ,নয়তো অভিমান হবে তোমার ছেলের।দেখো কেমন ঝগড়া বাধিয়েছে ,বল কিছু। "
"কী হয়েছে ,একটু ঘুমুতেও দিবিনা,শুধু কথা বলাবলি করতে হবে তোর সঙ্গে ?"
"দেখো কে এসেছে,তোমার সোনার চাঁদ ছেলে ,তাই ডাকলাম। "
"সে কি রে ,কখন এলি ?আমি তো ভাবছিলাম কাল আসবি। তাই তো আসিস বরাবর ,সংক্রান্তি দিন। "
"সুখবর আছে ,তাই আগেই চলে এলাম। "
চোখ থেকে হাসি ছড়িয়ে পড়লো মুখে ,তিনজনেরই। চারুলতা বললো ,"বল কী এমন সুখবর। "
ঝর্ণা শুধু হাঁ করে তাকিয়ে রইলো অপূর্বর মুখের দিকে। ভাবতে লাগলো কী এই সুখবর,তা কি তার নিজের জন্যও সুখের ?অপূর্ব কথাটা ভাঙছেনা,যেমন টিভিতে অ্যাডওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সাসপেন্স জাগিয়ে রাখার জন্য পুরস্কার প্রাপকের নাম ঘোষণা খানিক্ষণ ঝুলিয়ে রাখে সঞ্চালক।
"কী হলো,বল ,"জানতে চাইলো চারুলতা।
"মা, আমি এম এ পাশ করেছি,কাল রেজাল্ট বেরিয়েছে ," বলে মাকে কোলে তুলে নাচতে শুরু করলো অপূর্ব। ওকে বলে দাও বাড়িতে গিয়ে এসব যেন কাউকে না বলে,অর দাদুর কষ্ট হবে। আরেকটা খবরও আছে,সেটা না হয় পরেই বলবো ; আগে তো খেয়ে নিই। কী আছে দাও ,পেট জুরিয়ে নিই। "
"বড়মা ,তোমরা মায়ে-পোয়ে কথা কও ,আমি যাই। "
"ওমা !যাবে কোথায় ?ঢেকুর উঠছে নাকি ,কতক্ষণে খবরটা চাউর করে দেবে ,সেজন্য ?"
"আমি পেট পাতলা না। "
"না হলেই ভালো। "
চারুলতা জানে ওরা ঠেস দিয়ে কথা বলে এবং বোঝে, এর কারণ অনুরাগ। ছেলের ভালোলাগা-মান্দলাগাকে গুরুত্ব দেয় বলেই এবং তার সুবিবেচনা আছে এই ধারণা থেকেই এই অনুরাগ নষ্ট হবে এমন কিছু করেনা।এছাড়া,ঝর্ণাকে তারও ভালো লাগে। "কোথায় যাবি এখনই ,বস ,পরে যাবি ,আগে চিঠিটা দেখাতো ,এত সুন্দর লিখেছিস। দেখনা কী বলে আমার সোনার টুকরো ছেলে।" এই বলে হাত ধরে ঝর্ণাকে বসালো চারুলতা।ঝর্ণারও এখনই চলে যাওয়ার ইচ্ছে নেই।
"কী আর দেখাবো,আমাকে তো দেখতেই পারেনা তোমার ছেলে। "
"কে বলেছে ? দেখছি তো - ক্লিওপেট্রার মতো চুল ,পটলচেরা চোখ,আর্য রমনীর মতো সুচালো নাক ,ডালিমের মতো লাল ঠোঁট ......"
"থাক থাক, আর বলতে হবেনা ,জানা আছে কতটা মনের কথা। "
"তাই বুঝি ! তবে আস কেন ,চিঠি লেখাই বা কেন ,শুনি। "
"এই শুরু হলো ঝগড়া। নে চিঠিটা পড় ,তারপর বল ,"এই বলে চারুলতা ছেলের হাতে ঝর্ণার চিঠিটা তুলে দিলো।
কয়েক লাইনের চিঠি পড়তে কতটাই বা সময় লাগে। তাও মিনিট দশেক নিয়ে নিলো অপূর্ব। প্রতিটি কথা খুঁটিয়ে পড়েছে কয়েকবার। হাসি মুখে তাকালো ঝর্ণার দিকে, এরপর চারুলতার উৎসুক মুখের দিকে তাকিয়ে বললো ,"কী বলবো ,মা ? তুমি পরে বলে দাও যা বলার। কী ঝর্ণা ,মা-ই বলুক ,আমরা মেনে নেবো ,তাইতো ?"
"বড়মার কথাই শেষ কথা আমার কাছে। "
"এর পরও বড়মা ডাকবে নাকি !"
"কিসের পর ?"
"আমার আপত্তি নেই ,মায়ের মত থাকলে। "
"তাই নাকি?" বলে চারুলতার কাছে গিয়ে বসলো ঝর্ণা।
"আমি তো চাই তুই আমার কাছেই থাকবি। কিন্তু ...."
"কিন্তু কি ,বড়মা ?"জানতে চাইলো উদ্বিগ্ন ঝর্ণা।
"তুই তো জানিস তোর দাদু এবং বাবা এটা মেনে নেবেনা। তোকে বলেছিলামনা পান্ডবদের জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার সেই ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের কথা ? মনে আছে তো ?
"আছে ,তাতে কি ?"
"কথাটা জানাজানি হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তর উপর নেমে আসবে ভয়ংকর শাস্তির খাঁড়া ,আমরাও রেহাই পাবোনা। বড়ো ভয় করছে রে !"
"তোমার ছেলেও কি ভয় পাচ্ছে নাকি ?"
"ওদের ভয় পায়না এমন লোক আছে নাকি এই তল্লাটে ?"
"আমি ভয় পাইনা। কি করবে ,বড়জোর মেরে ফেলবে।সে দিয়ে তো আমার ইচ্ছেটাকে মারতে পারবেনা। ইচ্ছে যদি মারে তবে তা তোমার ছেলেই মারতে পারবে,বড়োমা। "
পরিবেশটা থমথমে দেখে অপূর্ব বললো ,"দ্বিতীয় সুখবরটা শুনবেনা,মা ?"
"তুই বললে তো শুনবো ,সব সময় তো মাকে উৎকন্ঠায় রেখে মজা পাস দেখছি ,"অনুযোগের সুরে বলল চারুলতা।
মাকে পাঁজাকোলা করে তুলে কানে কানে বললো ,"বিসিএস-এর রেজাল্ট বেরিয়েছে একই দিনে ,আমি সিলেক্ট হয়েছি। আগামী মাসে যোগদান। প্রথমে ট্রেনিং। যা রেঙ্কিং তাতে নিদেনপক্ষে এসডিও তো হতেই পারি। "
"কী বলিস,ঠিক তো, না ইয়ার্কি করছিস !"
"না মা ,এসব নিয়ে ইয়ার্কি করতে আছে ?" ঝর্ণার দিকে আঙ্গুল তুলে বললো ,"উনি তো রাষ্ট্র করে দেবেন ,মিথ্যে হলে আমার কী অবস্থা হবে, বলতো। "
"আচ্ছা ,তোর ভয় দেখছি শুধু ঝর্ণাকে। "
"ভয় তো পেতেই হয় ,তোমার আদরের না। ওকে ছাড়া তো তুমি থাকতেই পারবেনা। "
"আর তুই ? তোর বুঝি কোনো টান নেই ?"
"তোমার টানই তো আমার টান ,মা। "ঝর্ণাকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু এঁকে বললো ,"ঠিক বলেছি তো?"
"জানিনা ,ছাড়ো । সোজা কথা সোজাভাবে বলতে পারোনা ,আবার এসডিও হবে। সাহসতো নেই দেখছি এক ফোঁটা। "
"তা না থাকুক,পাশে তো একজন সাহসী লোক থাকছেই। "
"আমি তো আর এসডিওগিরি করতে পারবোনা !বড়মা আসি এখন,সন্ধে নেমে এলো। "
মন আনন্দে লাফাচ্ছে ,কিন্তু মুচকি হেসে অপূর্বকে চিমটি কেটে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আজকের মতো চলে গেল আনন্দের ঝর্ণা। জানতে চাইলোনা অপূর্ব এযাত্রায় কদিন থাকবে। জানে, পয়লা বৈশাখের পর যাবে,যেমন যায় প্রতি বছর। এবার হয়তো আরও দুয়েকদিন বেশি থাকতে পারে। আজ তো মোটামুটি পাকা একটা অধিকার জন্মেই গেলো তার অপূর্বর উপর। বললে নিশ্চয়ই থেকে যাবে ,ভাবছে ঝর্ণা।
রাতে শুয়ে ঝর্ণা বললো ,"মা ,অপূর্ব এসডিও হয়েছে ,কিছুদিনের মধ্যেই তুমি এসডিওর শাশুড়ি হতে চালেছো। ভালো লাগবেনা তোমার ?"